
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত স্টেশনে এক্সেস ব্যাগেজ চুরির ঘটনায় স্টেশন ম্যানেজারকে রক্ষা করতে কৌশলী ও দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে অনিয়মের স্পষ্ট তথ্য উঠে এলেও, কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও ব্যাগেজ চুরির জন্য প্রধান দায়ীদের চিহ্নিত না করে ‘তদন্তের সীমাবদ্ধতা’র অজুহাতে দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, এ ধরনের দায়িত্বহীন তদন্ত রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার আর্থিক ক্ষতি ও বিদেশি স্টেশনগুলোতে দুর্নীতির সংস্কৃতিকে আরও উসকে দেবে।একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর নজিরবিহীন ‘সিন্ডিকেট’তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাজাহান (পি-৩৬৪৮৯) লুটপাটের দুর্গে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে তার স্ত্রী শামিমা পারভীনকেও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি করিয়ে কুয়েত স্টেশনেই পদায়ন করান। একই বিদেশি স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর এমন যুগল দায়িত্ব পালনের ঘটনা বিমানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে:মানব পাচার (আদম পাচার)অতিরিক্ত লাগেজের নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিচোরাচালান এবংনিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।আকস্মিক তল্লাশিতে ধরা পড়ে অভিনব জালিয়াতিকুয়েত ফ্লাইটের যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ঝটিকা তল্লাশি চালান বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএম মেজর ফারহান তানভীর।কুয়েত থেকে আসা বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটটি ঢাকা অবতরণের পর ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করে দেখা যায়, ১৪ জনের মধ্যে ১২ জন যাত্রীই নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ওজনের পণ্য বহন করে এনেছেন। কিন্তু কুয়েত স্টেশনে এর জন্য কোনো ফি বা রাজস্ব আদায় করা হয়নি, এমনকি যাত্রীদের কাছে কোনো সরকারি রসিদও ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা সরকারি কোষাগারে যাওয়ার কথা থাকলেও তা সরাসরি কুয়েত স্টেশন ম্যানেজারের পকেটে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।তদন্ত কমিটির ‘দ্বিমুখী’ ভূমিকা ও ক্ষোভসিসিটিভি ফুটেজ এবং ১২ জন যাত্রীর অতিরিক্ত ওজনের লাগেজের মতো অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও তদন্ত কমিটি এক অদ্ভুত লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবেদনে সরাসরি কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার শাহজাহানকে দোষীও করা হয়নি, আবার নির্দোষও বলা হয়নি।”যেহেতু ঘটনাটি কুয়েত স্টেশনের, তাই ঢাকায় বসে এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা সম্ভব হয়নি।”— তদন্ত প্রতিবেদন থেকেতবে প্রতিবেদনের শেষ অংশে কমিটি স্বীকার করেছে যে উক্ত ঘটনায় ‘বিচ্যুতি’ বা অনিয়ম হয়েছে এবং কুয়েত স্টেশনকে ‘অ্যাকাউন্টেবল’ বা জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও বিমানের উপব্যবস্থাপক (হিসাব) সাজ্জাদুল ইসলাম নাসির বলেন, “সীমাবদ্ধতার কারণে দায়ীদের পূর্ণাঙ্গভাবে শনাক্ত করা যায়নি। তবে বিচ্যুতি যে ঘটেছে, তা আমরা সুপারিশে স্পষ্ট উল্লেখ করেছি।”ক্ষমতার পালাবদল হলেও ভাগ্য বদলায়নি বিমানেরবিমানের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও এই প্রভাবশালী দম্পতির খুঁটির জোর কমেনি। কুয়েত থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে মো. শাজাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ‘নামাজে যাচ্ছেন’ বলে এড়িয়ে যান এবং পরে ‘কিছু জানেন না’ বলে ফোন রেখে দেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সব অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও ‘ঢাকায় বসে তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি’—কমিটির এমন মন্তব্য হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।”