
ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হতেই পিছু নেওয়া, নির্জন রাস্তায় গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে সব লুটে নেওয়া—রাজধানী থেকে মফস্বল, সর্বত্রই এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম এই ‘ব্যাংক ট্র্যাকিং’ ছিনতাইকারী চক্র। তবে এবার শেষ রক্ষা হয়নি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেরার পথে এক নারীর ১ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত রহস্যের জট খুলেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই চক্রের মূল হোতা, কুখ্যাত ছিনতাইকারী সেলিম আহমদ ওরফে অনিক ওরফে ‘বটলা সেলিম’ (৩৮)-কে। উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও।বিজ্ঞ আদালতে আসামির দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে এক রোমহর্ষক তথ্য—জেলখানায় বসেই তৈরি হচ্ছে এসব ভয়ংকর ছিনতাই ও দস্যুতার সিন্ডিকেট! জামিনে বের হয়েই এরা মেতে উঠছে প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মরণখেলায়।নিচে এই রুদ্ধশ্বাস ঘটনার এবং তদন্তের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো:ঘটনার সূত্রপাত: পূবালী ব্যাংক থেকে পিছুটান ও প্রকাশ্য ছিনতাইগত ২২ জুন ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ১১:২০ ঘটিকায় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানাধীন শমসেরনগর পূবালী ব্যাংক শাখা থেকে ১,৪৩,০০০/- (এক লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার) টাকা উত্তোলন করেন ভুক্তভোগী রেহেনা বেগম। টাকা নিয়ে তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।গতিরোধ ও লুটপাট: সিএনজিটি আলীনগর ইউনিয়নের আলীনগর চা বাগান ফ্যাক্টরির দক্ষিণ পাশে কালীমন্দির সংলগ্ন সড়কে পৌঁছামাত্র পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ২টি মোটরসাইকেলে করে এসে ৪ জন অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারী তাদের গতিরোধ করে।অস্ত্রের মুখে ব্যাগ ছিনতাই: অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রেহেনা বেগমের নিকট থাকা নগদ ১ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা এবং ব্যাংক চেকসহ পুরো ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে চোখের পলকে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।মামলা দায়ের: এ ঘটনায় ভুক্তভোগী রেহেনা বেগম বাদী হয়ে কমলগঞ্জ থানায় ৩৯২ পেনাল কোডে একটি ছিনতাই মামলা দায়ের করেন (মামলা নং–১০, তারিখ–২৩/০৬/২০২৬ খ্রিঃ)।পিবিআই-এর ছায়া তদন্ত ও রুদ্ধশ্বাস অভিযানঘটনার পর থেকেই পিবিআই মৌলভীবাজার জেলা ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে মামলাটির স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই মৌলভীবাজার। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এসআই (নিঃ) আবুল কাশেমকে।তদন্তভার নেওয়ার পর পিবিআই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার শুরু করে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনার প্রধান পরিকল্পনাকারী ও আসামি ‘বটলা সেলিম’-কে শনাক্ত করা হয়। এরপর পিবিআই-এর একটি চৌকস দল চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অবশেষে বাকলিয়া থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত তার লাল রঙের মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়, যা ভুক্তভোগী বাদী নিজে শনাক্ত করেছেন।জেলখানার ‘অপরাধ ল্যাবরেটরি’: জবানবন্দিতে গা শিউরে ওঠা তথ্যগ্রেপ্তারের পর আসামি সেলিম আহমদ ওরফে বটলা সেলিমকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হলে সে স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করে। পিবিআই-এর তদন্ত ও সেলিমের জবানবন্দি থেকে জানা যায়:জেলখানায় সিন্ডিকেট গঠন: এই সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের অধিকাংশেরই একে অপরের সাথে প্রথম পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় জেলখানায় থাকাকালীন সময়ে।কারামুক্তির পর নেটওয়ার্ক: জেল থেকে বের হয়েই তারা পুরোনো যোগাযোগ সচল করে এবং পুরো সিলেট বিভাগজুড়ে সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতি, দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।ব্যাংক ট্র্যাকিং ও ছক: ঘটনার দিন তারা আগে থেকেই ওত পেতে ছিল। রেহেনা বেগম টাকা তুলে বের হওয়া মাত্রই তারা তাকে অনুসরণ করে এবং নির্জন চা বাগান এলাকায় গতিরোধ করে টাকা লুটে নেয়।৯ মামলার আসামি: এখনো কেন বাইরে?অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত এই বটলা সেলিমের অপরাধের খতিয়ান দীর্ঘ। তার বিরুদ্ধে সিলেট মহানগর, মৌলভীবাজার, সিলেট জেলা এবং সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, দস্যুতা ও ছিনতাই সংক্রান্ত প্রায় ০৯টি মামলা রয়েছে।প্রতিবাদী সওয়াল: যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৯টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে, সে কীভাবে বারবার আইনের ফাঁক গলে জামিনে বের হয়ে আসে? কেন এই পেশাদার অপরাধীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয় না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষকে? জেলখানা কি অপরাধ সংশোধনাগার নাকি নতুন অপরাধী চক্র তৈরির নিরাপদ আস্তানা—এই প্রশ্ন এখন এড়ানোর সুযোগ নেই।তদন্ত অব্যাহতপিবিআই মৌলভীবাজার জেলা জানিয়েছে, এই চাঞ্চল্যকর ছিনতাই মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের শনাক্ত এবং তাদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে সাঁড়াশি অভিযান এবং জোরালো তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পুরো সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলার দাবি ভুক্তভোগী মহলের।