
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ‘রাতের ভোট’ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান। সাত বছর পর প্রকাশ পাওয়া দুদকের নথি অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির নেপথ্যে ছিলেন পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ চার কর্মকর্তা।দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, দেশের ২০৮টি সংসদীয় আসনের ১৬ হাজার ৮৮৩টি ভোটকেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে ভোট ডাকাতি করা হয়। ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং শতভাগ ভোট পড়ার অবাস্তব ফলাফল দেখানো—সবকিছুই ছিল একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ।দুদকের নথিতে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন—সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী ও শহীদুল হক, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এ ছাড়া তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই চার কর্মকর্তা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনের একাংশ এবং স্থানীয় দলীয় চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেন। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণা—সব ধাপেই ছিল তাদের প্রভাব। নির্দেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।দুদক সূত্র জানায়, অনেক কেন্দ্রে মৃত, বাতিল বা অনুপস্থিত ভোটারদের উপস্থিতি দেখিয়ে শতভাগ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়। দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন আসনের নির্দিষ্ট কেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে ভোটের এই ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য নথিভুক্ত করেছে কমিশন।দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনকে বৈধ দেখাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক আনা হয়েছিল। অনুসন্ধান শেষে এই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে।এ বিষয়ে বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে পুলিশের একটি অংশ এই অনিয়মে জড়িত ছিল। তবে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার ও পেশাদারিত্ব বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার অঙ্গীকার রয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, দুদকের এই অনুসন্ধান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল। দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এটি একটি গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।