
শরিয়তপুরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো (বিএটি)–এর একটি ডিলার পয়েন্টে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় উদ্ধার করা ৫২টি মোবাইল ফোন এক বছর পার হলেও এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশের মালখানায় জমা দেওয়ার পর এসব আলামত রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে চরম অসঙ্গতি দেখা যাওয়ায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শরিয়তপুর জেলার পালং এলাকায় বিএটির একটি ডিলার পয়েন্টে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল লোকেশন ট্র্যাকিং ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডাকাত দলের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযানে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি পিকআপ ভ্যান, ডাকাতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ৫২টি নামি-দামি মোবাইল ফোন, যার অধিকাংশই স্মার্টফোন।মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা পালং মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া এক ডাকাতের বাসা থেকে এসব মোবাইল উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার শেষে পালং মডেল থানার তৎকালীন ওসি হেলাল উদ্দিন এবং নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ড. আশিক মাহমুদের উপস্থিতিতে মোবাইলগুলো থানার মালখানা অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর সায়েদুল ইসলামের কাছে জমা দেওয়া হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।পুলিশি বিধিমালা অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত আলামত মালখানায় গ্রহণের পর তা রেজিস্টারভুক্ত, সিলগালা এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সংরক্ষণ ও হস্তান্তর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই ঘটনায় সেই বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।সংখ্যার গরমিল, বক্তব্যে চরম বিভ্রান্তিদৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ–এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, উদ্ধার করা ৫২টি মোবাইলের মধ্যে অন্তত ৩০টির বেশি নামি-দামি স্মার্টফোন আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি (তদন্ত) মো. মাসুদুর রহমান বলেন,“আমি নিজ হাতে ৫২টি মোবাইল মালখানা অফিসারের কাছে জমা দিয়েছি। এখানে কোনো সন্দেহের সুযোগ নেই।”সাবেক ওসি হেলাল উদ্দিনও মোবাইল উদ্ধার ও মালখানায় জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।তবে মালখানা অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর সায়েদুল ইসলামের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট অসঙ্গতি। প্রথমে তিনি মোবাইল উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, ৪৫ থেকে ৪৮টি মোবাইল উদ্ধার হয়েছিল।অন্যদিকে মামলার পরবর্তী তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর জব্বার হোসেন জানান, তিনি মালখানা থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি মোবাইল দেওয়ার প্রস্তাব পান, যা অন্যান্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।যুক্তি মানছেন না বিশেষজ্ঞরামোবাইল ফোনগুলোর বর্তমান অবস্থান জানতে চাইলে মালখানা অফিসার দাবি করেন,“মোবাইলগুলো এখনও মালখানায় আছে। মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় এবং বেশিরভাগ নষ্ট থাকায় হস্তান্তর করা হয়নি।”তবে আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। তাদের মতে, প্রতিটি মোবাইল ফোনের স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরদের সহায়তায় খুব সহজেই প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে মোবাইল ‘নষ্ট’ বা ‘মালিকানা অনিশ্চিত’—এই যুক্তি টেকসই নয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনায় মালখানা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর গাফিলতি কিংবা সংঘবদ্ধ অনিয়মের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও জনআস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।