
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তান্ত্রিক সেজে এবং রাসায়নিক কৌশলে শারীরিক ক্ষতিসাধন করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।গ্রেফতারকৃতরা হলেন— অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪), মাহে আলম (২৭) এবং মো. হাসান আলী (২০)। গত ২৪ জুলাই রাতে ও সকালে কুমিল্লা এবং নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর)-এর একটি বিশেষ দল তাদের গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড জব্দ করা হয়।যেভাবে ঘটনার সূত্রপাতমামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী মোছাঃ সালমা আক্তার স্বামী পরকীয়া দূর করার উদ্দেশ্যে ফেসবুকে “রহমত আলী কবিরাজ” নামের একটি আইডির মাধ্যমে তান্ত্রিকের সন্ধান পান। প্রতারক চক্রটি প্রথমে হাদিয়া ও কবুতর কেনার কথা বলে ৫,০০০ টাকা নেয়। পরবর্তীতে জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনে ইমু ভিডিও কলে তাদের নির্দেশনামতো ব্যবহার করতে বলে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীর বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ও আশ্বাস দিয়ে আরও ১৬,০০০ টাকাসহ সর্বমোট ২১,০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় চক্রটি।এ ঘটনায় ভুক্তভোগী খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে পিবিআই স্ব-প্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।রাসায়নিক বিক্রিয়া ও প্রায় ২০০ জন দগ্ধপিবিআইয়ের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি “তান্ত্রিক কবিরাজ”, “হোসেন কবিরাজ”, “আসমা কবিরাজ” ইত্যাদি ভুয়া ফেসবুক আইডি ও পেজ ব্যবহার করে নারীদের টার্গেট করত। তারা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালু বা নাভিতে চেপে ধরতে বলত, যার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি হতো। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে একই ধরনের কেমিক্যাল ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও বুস্টিংতদন্তে আরও উঠে আসে, চক্রটির নেটওয়ার্ক পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিস্তৃত ছিল। সেখানে ভুয়া ফেসবুক পেজ চালিয়ে ‘গুগল পে’ (Google Pay)-এর মাধ্যমে অর্থ নিয়ে পরবর্তীতে ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে আসত তারা। নতুন ভুক্তভোগী বানাতে তারা নিয়মিত বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজগুলো বুস্টিং করত।গ্রেফতারের পর আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছে এবং অহিদ মিয়া ও মো. হাসান আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন।পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও-এর বিশেষ পুলিশ সুপার জনাব মোঃ ফজলে এলাহী বলেন, “ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণাকারী চক্রের বিরুদ্ধে পিবিআই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত তান্ত্রিক বা কবিরাজের প্রলোভনে না পড়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”ঘটনায় জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেফতার ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।