
সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ক্রয়, টেন্ডারে কারসাজি এবং নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছর পার হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।তদন্তে ভিসির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম, প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান—মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওএমআর ফরম ও উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য এমনভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে, যাতে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। তদন্তে বিড রিগিং (টেন্ডার কারসাজি) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।তদন্ত অনুযায়ী, লট-১-এ মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় এবং লট-২-এ প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকায় কার্যাদেশ পায়। দুই লটে মোট ব্যয় হয় প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী ভিসি সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকার ক্রয় অনুমোদন দিতে পারেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। কিন্তু সেই বিধান উপেক্ষা করে ভিসি নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেন।কমিশনের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, একই ক্রয়কার্যে ওপেন টেন্ডারিং, ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস এবং ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট—এই তিন ধরনের পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।এছাড়া যোগ্যতা নির্ধারণে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করে প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়াই অযোগ্য ঘোষণা করার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব পদক্ষেপ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছিল।অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজন থাকায় সরল বিশ্বাসে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।তবে তদন্ত শেষে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন সরকারি সব ক্রয় ই-জিপি ব্যবস্থার আওতায় আনা, টেন্ডার কারসাজি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় খাতে অনিয়ম দীর্ঘদিনের সমস্যা। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে। সংস্থাটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।