
দীর্ঘ এক দশকের বিচারহীনতার গ্লানি পেরিয়ে অবশেষে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায়। কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে এবার তদন্তে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যা দেশের বিচারপ্রত্যাশী মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আদালতের নির্দেশে সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহিনুলসহ সংশ্লিষ্টদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদক্ষেপ মামলার গতিপথে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।২০১৬ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনায় তনুকে উদ্ধার করা হয় মৃত অবস্থায়। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন, রক্তাক্ত মুখমণ্ডল এবং কাঁচি দিয়ে কেটে দেওয়া চুলের অবস্থা থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল এটি একটি নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে প্রথম দুই দফা ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ব্যর্থতা এবং ধর্ষণের আলামত গোপনের অভিযোগ জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাকে তিনজনের ডিএনএ শনাক্ত করে এবং নিশ্চিত করে যে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এতে অপরাধীদের শনাক্ত করার পথ উন্মুক্ত হলেও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সেই ডিএনএ কোনো সন্দেহভাজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি।উল্লেখ্য, তনু নিখোঁজ হওয়ার আগে সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে গিয়েছিলেন, যা তাকে শুরু থেকেই সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল। তনুর পরিবার বারবার অভিযোগ করে আসছিল যে প্রভাবশালী মহলের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ এবং গ্রেপ্তার-রিমান্ডের এই অগ্রগতি মামলাটিতে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে জনমনে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—কোন শক্তি এতদিন এই মামলার অগ্রগতি আটকে রেখেছিল?বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার বিচার শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রমাণেরও বড় পরীক্ষা। আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তির যুগে সঠিক তদন্ত হলে সত্য গোপন রাখা সম্ভব নয়।তনুর পরিবারসহ দেশবাসীর একটাই দাবি—দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া এই বিচারিক অগ্রযাত্রা যেন আর কোনো বাধায় থেমে না যায়, সেটিই এখন সবার প্রত্যাশা।