
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তার জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান–এর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া জানান, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জিয়াউল আহসান ক্রমেই উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করেন এবং তার সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই জিয়াউল আহসান এডিজি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ) সূত্রে জানা যায়, কর্নেল জিয়া তার আবাসিক টাওয়ারে ব্যক্তিগত গার্ড নিয়োগ, বাসায় অস্ত্র রাখা এবং পুরো ফ্ল্যাটে সিসিটিভি বসানোর মতো সামরিক বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন।ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, এসব বিষয়ে তাকে সরাসরি সতর্ক করা হলেও পরবর্তীতে তার আচরণ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল তার সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য করেছিলেন, জিয়াউল আহসান এমন মানসিক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, যাকে বোঝানো কার্যত অসম্ভব।জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে জিয়াউল আহসান সেনাপ্রধানের নির্দেশনাও চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম অংশে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করা হয়, যদিও পূর্ব অংশে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চিত্রও উঠে আসে। ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ১৯৯৬–২০০১ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে একক ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত করার কৌশল গ্রহণ করেন। এর অংশ হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রণয়ন করা হয়।তিনি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীতে মেধাবী ও স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাদের ‘বিএনপি বা জামায়াতপন্থি’ আখ্যা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের জায়গায় আনুগত্যের ভিত্তিতে অপেক্ষাকৃত অযোগ্য কর্মকর্তাদের বসানো হয়। ২০০৯ সালের পর থেকে একদল অনুগত কর্মকর্তা ক্লিন হার্ট ও জরুরি শাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।জবানবন্দিতে বলা হয়, নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তারেক আহমেদ সিদ্দিকী ধীরে ধীরে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার নির্দেশনায় ডিজিএফআই, এনএসআই ও র্যাব গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজি, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করেন সাবেক সেনাপ্রধান।উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ আগামী ১৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে আদেশ দেবেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।