
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রায় ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্যাকেজ গোপন রেখে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ ও তালিকাভুক্ত ঠিকাদাররা, আর প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা।স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৩৬টি প্যাকেজের আওতায় দুই শতাধিক গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন কাজ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফায় মাত্র ২৩টি প্যাকেজ ওপেন টেন্ডারে দেওয়া হয়েছে। বাকি প্যাকেজগুলো কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই গোপনে বণ্টন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিটি কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বরাদ্দের ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও ইজিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।লটারির আগেই নির্ধারিত ঠিকাদারশুধু টেন্ডার আহ্বানেই নয়, ইজিপি টেন্ডার শেষে লটারির প্রক্রিয়াতেও চরম কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ঠিকাদার জানান, লটারির আগেই ঠিক করে রাখা হয়—কোন ঠিকাদার কোন কাজ পাবে। ফলে লটারি এখন কেবল নামমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।তালিকাভুক্ত ঠিকাদার নীল কৃষ্ণ বলেন,“গত বছর লটারিতে একটি কাজও পাইনি। এবারও টেন্ডার ড্রপ করেছি, পাব কিনা জানি না। এখানে সব সময়ই কারচুপি চলে।”প্রকৌশলীর অফিসেই ঠিকাদারদের আড্ডাউপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। একাধিক সংবাদকর্মী ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আনোয়ারায় যোগদানের পর উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের অফিস যেন নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের স্থায়ী আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। অফিসে গেলেই দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদার সামনের সারির চেয়ারে বসে থাকেন।অভিযোগ রয়েছে, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঠিকাদারি করতেন, তারাই এখন নিজেদের বিএনপির ত্যাগী নেতা পরিচয় দিয়ে প্রকৌশলীর ছত্রচ্ছায়ায় কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন।অতীতেও অভিযোগ, হয়নি শাস্তিস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে অভিযোগ ওঠার পর তাকে বাঁশখালী উপজেলায় বদলি করা হয়। সেখানে বদলি শেষে পুনরায় তিনি আনোয়ারায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অতীতে কোনো শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় তিনি আবারও একই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন।লাইসেন্স নবায়নে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগচলতি বছরে ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা হলেও প্রায় একশ’ ঠিকাদারের কাছ থেকে লাইসেন্সপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ঠিকাদার মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।এছাড়াও ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সড়কের কাজ ফেলে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে গোপনে আবার কাজ করার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা উন্নয়ন কাজের মান ও স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।ঠিকাদার সুমন বলেন,“কিছু পছন্দের ঠিকাদারকে টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ায় আমরা একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে গিয়েছি। সবাইকে সমান চোখে দেখার অনুরোধ করেছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি।”অভিযুক্তের বক্তব্য ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াএ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো ঠিকাদারদের সামনে সংবাদকর্মীর সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিজের সম্মানহানির অভিযোগ তোলেন।অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন বলেন,“অনিয়মের বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”তদন্ত দাবিএলাকাবাসী ও সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা উদঘাটন করে উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় আনোয়ারার উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।