শতকোটি টাকার আলীশান ভবনের রহস্যনিউজ ডেস্কপ্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬সরকারি কর্মচারীদের অস্বাভাবিক সম্পদে ভরে উঠছে ময়মনসিংহ নগরী। আলীশান ভবন ও অভিজাত ফ্ল্যাট–অ্যাপার্টমেন্টে নগরীটি যেন পরিণত হয়েছে আরেক ‘বেগমপাড়া’তে। বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কেরানি, ক্যাশিয়ার, হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, সরকারি কলেজের শিক্ষক, ভূমি কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস ও পিওনদের মালিকানায় গড়ে উঠেছে ৮ থেকে ১৬ তলা বিশিষ্ট বহুতল ভবন।অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক কর্মচারী যৌথ মালিকানায় নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি, আকুয়া মড়লপাড়া (হাজীবাড়ি), আমলাপাড়া, মাসকান্দাসহ অন্তত ৪৯টি এলাকায় ইতোমধ্যে আলীশান ভবন গড়ে উঠেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে আরও শতাধিক ভবন।দুদকে অভিযোগ, শুরু হয়েছে অনুসন্ধানঅনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন আবুল খায়ের নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলীশান ভবনের পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ একর জমি ক্রয় করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিকাংশ সম্পত্তি রাখা হয়েছে স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের নামে। কেউ কেউ কানাডা, দুবাই ও ভারতে বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও তথ্য মিলেছে। স্থানীয়দের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে—ময়মনসিংহে গড়ে উঠেছে ‘আরেক বেগমপাড়া’।তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাও কোটিপতিতৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪৩ জন কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ৬৭ জন অস্বাভাবিকভাবে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন। কারও কারও সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে বহালময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে কর্মরত ছিলেন এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে তারা বছরের পর বছর বদলি এড়িয়ে যান। লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত কার্যকর হয়নি। দুদকের কিছু মামলা হলেও প্রভাবশালীরা থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।আলোচিত ভবন ও কোটিপতি তালিকাগোলকিবাড়ি এলাকার ১১ তলা ‘স্বপ্ন টাওয়ার’, আকুয়া হাজীবাড়ি মোড়ের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টাওয়ার’, ‘ইব্রাহিম টাওয়ার’ ও ‘ইউলিটি টাওয়ার’ নির্মাণ করে আলোচনায় এসেছেন একাধিক সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষক।কোটিপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক, ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল গনি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন আলম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামসহ অন্তত ৩০ জন।শতকোটি টাকার অভিযোগময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, জালিয়াতি ও স্টাফ কোয়ার্টার বরাদ্দে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুটি তদন্ত চলমান রয়েছে।ক্যাশিয়ার এনামুল হকের যৌথ ভবনদুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক ও তার ঘনিষ্ঠ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে গোলকিবাড়ি এলাকায় ১১ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এতে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২৪ কোটি টাকা। এনামুল হক দাবি করেছেন, তারা ধাপে ধাপে ভবন নির্মাণ করেছেন।উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ অনুসন্ধানী টিমকে বিস্মিত করেছে। ময়মনসিংহের আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়িতে ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ১১ তলা ভবন এবং ৪৫ শতাংশ জমির মালিক তিনি। রাজধানীর উত্তরা ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।আইনজীবীদের মন্তব্যবাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. আজীম বিল্লাহ জয়নাল বলেন,“এতদিন কানাডা বা লন্ডনের বেগমপাড়ার কথা শুনেছি। এখন ময়মনসিংহেও বেগমপাড়া—আর তা গড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই। যাদের জানার দায়িত্ব ছিল, তারা না জানলে দায় এড়াতে পারেন না।”এ ঘটনায় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে।
