মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পলাতক থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লিতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তারা দল পুনর্গঠন ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কৌশল নিয়ে নিয়মিত বৈঠক ও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এর পরপরই আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালান। তাদের মধ্যে অন্তত ৬০০ জন কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।গণচাপের মুখে গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দলটিকে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।গত বছরের শেষ দিকে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা এই রায়কে ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, দিল্লিতে গোপন অবস্থান থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে নিয়মিতভাবে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে কৌশলগত বৈঠক করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে ভোটের গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দলটির সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়া বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস, দাবি করছে—এই নির্বাচন গত এক দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হবে। তবে আওয়ামী লীগ ইউনূসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার অভিযোগ তুললেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, নির্যাতন, গোপন বন্দিশালা, বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও সংবাদমাধ্যম দমনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুতির পর এসব গোপন বন্দিশালার একাধিক তথ্য প্রকাশ্যে আসে।তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। শেখ হাসিনাকে দণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মান মেনে পরিচালিত হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পর্যবেক্ষকরা।আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, দেশজুড়ে প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় তাদের শত শত নেতা-কর্মী নিহত বা কারাবন্দী হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, দেশে ফিরলে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় তারা ভারতে অবস্থান করছেন।ভারতের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ‘অবমাননা’ বলে উল্লেখ করে।কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দাবি করেছেন, আসন্ন নির্বাচন ব্যর্থ হলে দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে এবং সেই পরিস্থিতিতে জনগণ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে। সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় স্বীকার করেছেন, দলটি কর্তৃত্ববাদী ছিল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে তার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি স্থায়ী নয় এবং দলের নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
