জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আসামি হলেও গ্রেপ্তারের হার তুলনামূলকভাবে কম। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদেরও বড় একটি অংশ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত প্রায় দেড় বছরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মোট ৪ হাজার ১৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় মোট ২ লাখ ২৪ হাজার আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭৫ হাজার ৪০০ জন, যা মোট আসামির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিভিন্ন সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে গেছেন।সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবির সম্মেলন কক্ষে ‘স্বৈরাচারের পতনের দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব মামলার বড় একটি অংশেই ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, মোট আসামির প্রায় দেড় লাখই ঢালাও মামলার শিকার, যাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৪ জন। ঢালাও মামলার বড় উদাহরণ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৬৬৩টি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই হত্যা মামলা।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ছাত্র-জনতার হত্যাকারী, নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৩৭টি হলেও চার্জশিট দাখিল হয়েছে মাত্র ১০৬টি মামলায়। হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিলের সংখ্যা মাত্র ৩১টি।এসব মামলায় পতিত সরকারের ১২৮ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে হত্যার অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৭৬১টি মামলায় ১ হাজার ১৬৮ জনকে আসামি করা হলেও গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৬১ জন।প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে কিছু অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ৪৫০টি অভিযোগ ও ৪৫টি মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৮৪ জন। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুটি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। একটি মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য একটি মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে মোট ১২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে ১০৫ জনের বেশি অভিযুক্ত রয়েছেন।টিআইবির প্রতিবেদনে ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—অনেক অভিযুক্তের গোপনে দেশত্যাগ, দেশত্যাগে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তার অভিযোগ, পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা এবং ঢালাওভাবে আসামি করার প্রবণতা।
